মো: ছোলায়মান।
আমি সেই কণ্ঠ—
যে কণ্ঠ মাটির গভীর থেকে উঠে এসে
প্রশ্ন করে আজকের বাংলাদেশকে—
কেন স্বাধীনতার পতাকা
এক আকাশের নিচে উড়েও
আমাদের হৃদয়গুলো এত বিচ্ছিন্ন?
কেন একই নদীর জল পান করে
একজন আরেকজনের চোখে
শত্রুর প্রতিচ্ছবি খোঁজে?
আমরা তো একই মাটির সন্তান,
একই ভাষায় উচ্চারণ করি মায়ের নাম,
একই বর্ষার জলে ভিজে যায়
আমাদের গ্রামের পথ,
একই রৌদ্রে পুড়ে যায়
শ্রমিকের কপাল, কৃষকের জমি,
একই আকাশে উড়ে যায়
আমাদের স্বপ্নের পাখি।
তবু কেন—
মানুষের আগে দল,
দেশের আগে বিভাজন,
ভ্রাতৃত্বের আগে প্রতিহিংসা?
ক্ষমতার পালাবদলে
কেন মানুষের মুখ বদলে যায়?
যে হাত গতকাল করমর্দন করেছে,
আজ সেই হাতেই কেন
অবিশ্বাসের প্রাচীর?
আমি সেই প্রাচীরের বিরুদ্ধে—
যে প্রাচীর মানুষের বুককে
মানুষের বুক থেকে পৃথক করে।
আমি সেই বৈষম্যের বিরুদ্ধে—
যেখানে জন্মের পরিচয়
মানুষের মর্যাদার মাপকাঠি হয়,
যেখানে ক্ষমতার ছায়ায়
কেউ পায় অধিকারের সূর্য,
কেউ দাঁড়িয়ে থাকে
অন্ধকারের কিনারায়।
আমি বলি—
মানুষকে ছোট করে
কোনো পতাকা বড় হয় না,
অন্যের অধিকার কেড়ে
কোনো স্বাধীনতা পূর্ণ হয় না।
স্বাধীনতা শুধু
একটি পতাকা নয়,
শুধু একটি মানচিত্র নয়,
শুধু ইতিহাসের বুকে
রক্তে লেখা কোনো বিজয়ের নাম নয়—
স্বাধীনতা হলো
অন্যের মুখে নিজেরই মুখ দেখা,
অন্যের অধিকারে নিজের অধিকার চিনে নেওয়া,
ক্ষুধার্তের পাশে অন্ন হয়ে দাঁড়ানো,
অন্যায়ের সামনে
নিজের ভয়কে অতিক্রম করা।
হে বাংলাদেশ,
তোমার নদীগুলো কি
দল দেখে সাগরে মেশে?
তোমার ধানের শীষ কি
মানুষের পরিচয় জিজ্ঞেস করে দোলে?
তোমার আকাশ কি
ভিন্ন পতাকার মানুষের জন্য
ভিন্ন নীল রঙ রাখে?
না—
প্রকৃতি আমাদের বিভক্ত করেনি,
আমরাই নিজেদের চারদিকে
অদৃশ্য সীমানা এঁকেছি।
তাই আজ
আমি কোনো দলের কণ্ঠ নই,
কোনো গোষ্ঠীর কণ্ঠ নই—
আমি মানুষের কণ্ঠ হতে চাই।
যে কণ্ঠ বলবে—
এসো,
প্রথমে মানুষ হই;
তারপর যার যার মত থাকুক,
যার যার পথ থাকুক,
ভিন্ন বিশ্বাস, ভিন্ন চিন্তা,
ভিন্ন স্বপ্ন—
তবু দেশটি হোক সবার।
কারণ মতের ভিন্নতা
শত্রুতার জন্মদাতা নয়;
ভিন্ন নদীও তো
একদিন সমুদ্রেই মেশে।
এসো,
ঘৃণার উত্তরাধিকার ভেঙে
সন্তানদের হাতে তুলে দিই
একটি মানবিক আগামী।
যেখানে ক্ষমতা হবে
সেবার দায়িত্ব,
অধিকার হবে
সবার সমান আলো,
আইনের দরজায়
ধনী-দরিদ্রের জন্য
একই প্রবেশপথ।
যেখানে রাজনৈতিক পরিবর্তন
মানুষের হৃদয়ে
প্রতিশোধের আগুন জ্বালাবে না;
বরং শেখাবে—
আজ যে পাশে আছে,
কাল সে অন্য পাশে থাকলেও
সে আমারই দেশের মানুষ।
আমি সেই বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখি—
যেখানে বিজয় মানে
অন্যের পরাজয় নয়;
যেখানে এগিয়ে যাওয়া মানে
পেছনে পড়ে থাকা মানুষটিকে
পদদলিত করে ওঠা নয়।
আমি সেই ভোরের অপেক্ষায়—
যেদিন রাজনীতির আগে
মানুষের মুখ দেখা হবে,
দলের আগে
দেশের কথা উচ্চারিত হবে,
ক্ষমতার আগে
মানবতার শপথ নেওয়া হবে।
সেদিন—
কৃষকের মুঠো মাটি
শ্রমিকের ঘাম
শিক্ষার্থীর স্বপ্ন
শিক্ষকের জ্ঞান
নারীর সাহস
যুবকের প্রত্যয়
এক নদীর স্রোতের মতো
মিলিত হবে বাংলাদেশের বুকে।
আর তখন কেউ বলবে না—
“তুমি কোন দলের?”
মানুষ শুধু বলবে—
“তুমি আমার দেশের মানুষ।”
সেই একটি বাক্যের জন্যই
হোক আমাদের সমস্ত সংগ্রাম।
ভেঙে যাক
বৈষম্যের অন্ধ কারাগার,
মুছে যাক
ঘৃণার উত্তরাধিকার,
নিভে যাক
প্রতিহিংসার অগ্নিশিখা।
জেগে উঠুক সেই বাংলাদেশ—
যে বাংলাদেশে স্বাধীনতা
কেবল ইতিহাসের অর্জন নয়,
প্রতিদিনের জীবনে
মানুষের মর্যাদার নাম।
আমি সেই কণ্ঠ—
যে বিভেদের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে
ঐক্যের গান গাইবে না শুধু,
আমি সেই কণ্ঠ—
যে মানুষকে মানুষ বলে ডাকবে
এবং বলবে—
তুমি আমি পৃথক নই,
পৃথক শুধু আমাদের পথ;
এই মাটি এক,
এই আকাশ এক,
এই ভাষা এক—
আর বাংলাদেশ
আমাদের সবার।
মন্তব্য করুন